নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। তথাকথিত চুচিলরা সহিংস হতে পারে না, লেবাসের কারনে। এইজন্য তাদের বক্তব্যে, প্রবন্ধে উপন্যাসে কিংবা কবিতায় তারা যৌনশুড়শুড়ির মাধ্যমে নারীকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যেন নারী শুধুমাত্র একটি যৌনক্রীকলাপের যন্ত্র বিশেষ ছাড়া কিছুই না। আমি নিজেও এর ব্যতিক্রম না। হতে পারলে নিজেকে একজন শুদ্ধ মানুষ হিসেবে বিবেচনায় নিতে পারতাম এবং সস্তি পেতাম। অন্য কোন পুরুষকে দোষ কিংবা কটাক্ষ করে লিখবো না। নিজে নারীকে নিয়ে কি ভাবি তাই লিখবো। একটা কথা আগেই বলে রাখি। ইদানিং, শালার নিজের এই নারীবান্ধব কথাবর্তায় একটা সমস্যা খুব প্রকটভাবে লক্ষ্য করছি। পুরুষদের কাছে আমি হয়ে যাচ্ছি তথাকথিত নারীবাদী অথবা নারী সমঅধিকার বিশ্বাসী হিসেবে। আদতে আমি তা না, আমি আমি নারীবাদী না, নারী সমঅধিকারেও বিশ্বাসী না, আমি নারী অধিকারে, মানবাধিকারে বিশ্বাসী। এইজন্য আবার নারীর কাছে হয়ে যাচ্ছি নারী বিদ্বেষী হিসেবে। এই সংক্রান্ত কবি নজরুলের বিষদ একটা লেখা অনেকদিন আগে আমি পড়েছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে একজন নারীকে আমি, শুধুমাত্র একজন মানুষ হিসেবে দেখতে চাই। কিন্তু এই দেখতে চাওয়াতে, আর বাস্তবতার নিরিখে আমি কিন্তু এক না। আমার নারীর প্রতি আছে হিংসা, ক্ষোভ, লালসা। নারীদের কাছে নিজের অযোগ্যতাকে ঢাকার জন্য, নারীর সার্বজনীনতাকে অস্বীকার করি। এটা আমার ব্যক্তিগত অনুধাবন। অন্যকে দোষ দিয়া লাভ কি বলেন। নারীর অতীত ইতিহাস অনেক সংগ্রামী, গৌরবোজ্জল এবং সাফল্য মন্ডিত। অতীতের ঘটনা আমি বলবো না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিকট অতীত এবং বর্তমান কিছু চিত্র তুলে ধরে আমার নারীর প্রতি সহিংস, হিংসা, ক্ষোভে এবং লালসার কারন আমি উল্লেখ্য করবো।
সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের জাতীয়ভাবে সাফল্য অনেক… যা ঈর্সনীয় পর্যায়ে যেমন: বাংলাদেশের ছত্রীসেনা (প্যারাট্রুপার) সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌস, মেজর নুসরত নুর আল চৌধুরী।। লাকসাম থেকে নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে সফলভাবে ট্রেন চালিয়েছেন সালমা খান। বাংলাদেশী নারী পর্বতারোহী নিশাত মজুমদার ও এখন পর্যন্ত সর্বকনিষ্ঠ বাংলাদেশী নারী পর্বতারোহী ওয়াসফিয়া নাজরীন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নারী ডেপুটি গভর্নর হলেন নাজনীন সুলতানা। পুলিশের অবদানকে শিকার করে নিয়ে তাদেরকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন জিনাত জোয়ার্দার রিপা এবং জাতীর সম্মান রক্ষা করেছেন, যেটা পুরুষদের মাথায় আসেনি, উনি সেটা করে দেখিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রথম নারী কার্ডিওলজিস্ট হাসিনা বানু। শাহবাগের স্লোগান কন্যাদের কন্ঠের উত্তাপে উজ্জীবিত ছিল সারাদেশ। দিন-রাত স্লোগানের ঝড় তুলেছে লাকি, শাম্মি, নোভেরা, মুক্তা বাড়ৈ, প্রগতি বর্মন, সুষ্মিতা রায় সুপ্তি, জয়শ্রী রায়, তানিয়া, সামিয়া রহমান, উম্মে হাবিবা বেনজির, তানজিদা। আহত পুলিশকে রক্ষা করে পুলিশ যা পারেনি তাই করে দেখিয়েছেন ঝর্ণা বেগম।
ব্যক্তিজীবনে আমি অনেক নারীর সাথে কাজ করেছি, অনেক নারীর সান্নিধ্যে এসেছি। কত নারীর কাছ থেকে কত কিছু আমি শিখেছি, তার ইয়াত্তা নাই। স্কুলে পড়ার সময় স্যারেরা আমার দুষ্টামীর কারনে কতশত শাস্তি দিছে। (প্রসঙ্গ বলে রাখি, প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ জীবনে কত মাইর আমি খাইছি শুধু দুষ্টামীর জন্য, পড়ার জন্য মাইর খাইছি বইলা মনে পড়ে না) কিন্তু ম্যাডামদের কাছ থেকে পেয়েছি স্নেহ… প্রাইমারী স্কুলের দিলরুবা আপার কথা এখনও মনে আছে, পেন্সিল ধরা শিখিয়েছেন। একান্ত মনোযোগ দিয়েছেন খালেদা হায়দার ম্যাডাম, দুবোর্ধ্য সব সমিকরন শিখিয়েন নিজের সন্তানের মতো করে। কলেজে উঠে আমি টিচারদের আসে পাসে থাকতাম, এটা ওটা প্রশ্ন করে শিক্ষকদের মাথা আউলায়া ফালাইতাম। স্যারেরা ধমক দিতেন, বিরক্ত হতেন। কিন্তু ম্যাডামরা যত্ন নিতেন, প্রশ্নের উত্তর দিতেন। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ার বাইরে কতশত প্রশ্ন আমার। কত সময় ম্যাডামদের দুপুরের খাবারের ভাগ আমি পাইছি তার ঠিক নাই। কর্মজীবন শুরু হওয়ার পর কাজ শিখেছি বেশির ভাগ আপাদের কাছ থেকেই, পুরুষ কলিগরা আড্ডা মারে কাজ শিখাইতে চায় না। ব্যতিক্রম ছিল না, তা না। কিন্তু সাপোর্ট পাইছি বেশি আপাদের কাছ থেকে। এখন কর্মস্থলে দেখি পুরুষ সহকর্মীদের চাইতে নারী কলিগরা বেশি হেল্পফুল। আমার অফিসের শারমীন আপা একাই দেখি দুনিয়ার কাজ নিয়া অস্থির হইয়া থাকে (ইনার সাথে আন্তরিকতাটা বড্ড বেশি, ঝগড়াও বেশি হয়)। আখি আপার কাছ থেকে কিছু বুঝতে চাইলে, সুন্দর করে বুঝানোর চেষ্টা করে। এর রকম আরো আছে। ব্যাংক এশিয়ার তামান্না আপা, ডাচ বাংলার লুৎফা আপা, কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপর্না ম্যাডাম কার কথা বলবো, সবাই দেখি নিজ নিজ অবস্থানে ঈর্ষনীয় সাফল্য পাইছে এবং সহযোগিতাটাও করে আন্তরিকভাবে।
রাজনৈতিক জীবনেও দেখছি ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি লুনা নূর, তুখোড় বক্তা! জলি তালুকদার ওরে বাপ, একলাই ১০ পুরুষের কাজ করে কোন অভিযোগ ছাড়াই। সুচিত্রা আহা বচন এত চমৎকার ছিল। কিংবা বলি মিতারয়, শামীম আরা নীপা আপু অথবা আফরোজা শীলার কথা, ক্লিয়ার কনসেপ্ট কোন হাঙ্কিপাঙ্কি নাই। সাজিদা ইসলাম পারুল, অনিকা ফারজানা সাংবাদিকতা করে পুরুষদের সাথে পাল্লা দিয়া। মনিরা ম্যাডাম একটা গার্মেন্ট বায়িং হাউজের মালিক! ঢাবি শিক্ষক কাবেরী আপা দারুন লিখে। আমার এক মামী কলেজে পড়ান, কিন্তু বয়স আমার কাছাকাছি, কলেজ থেকে নাকি এ্যাওয়ার্ডও পায়। আর যে বালটা ফালাইতে আমাদের পুরুষ টাইগারদের লাগছে ২৫ বছর আমাদের বাঘিনীরা করে দেখাইছে তাদের যাত্রার শুরুতেই, বাঘিনী বাহিনীর সালমা খাতুনের নেতৃত্বে।
আমার সহযাত্রী অনেক নারী আছেন যারা আমাদের সাথে পাল্লা দিয়া ট্রেনে উঠেন, মাঝে মাঝে অবাক হই। পরিবারের প্রয়োজনে হোক আর নিজের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য হোক এরা কর্মস্থলে যায় আমার সাথে টক্কর দিয়ে। ট্রেনে যারা চলাফেরা করে তারা কিঞ্চিৎ অনুধাবন করতে পারবেন।
আর সবশেষে বলি, এই এতযে লাফাই! কনতো দেখি দেশের অর্থনীতির চাকা বেশিরভাগ নির্ভর করে কিসের উপর? উত্তরে বলবেন পোষাক শিল্প! এই পোষাক শিল্প টিকায়া রাখছে নারীরা… অক্লান্ত পরিশ্রমে। আদরকের বস্ত্রবালিকা, সেলাই দিদিমনি যেই নামেই ডাকেন না কেন! এদের কাছে আমার ঋন অনেক। হিসেব চাইলে শুধরাবো কি করে? সময় আসতেছে, হিসেব কিন্তু কড়ায় গন্ডায় মিলায়া নিবে, অতএব সাধু সাবধান।
এরা যা করে দেখিয়েছে বা করে যাচ্ছে তার তুলনা করা যায় না। তুলনা করে তাদের ছোট করার কোন ইচ্ছা আমার নাই। সম্মান দেখাতে চাই।
স্যালুট টু ইউ, ডিয়ার!… খোদার কসম মন থেকে দিচ্ছি এই সম্মান। আপনারা আমার এই সালাম গ্রহন করুন।
এই যে এতযে বললাম, মোটামুটি নিজ গুনে এরা সুপরিচিত। নিজ নিজ অবস্থানে সুপ্রতিষ্ঠিত! সংগত একটা প্রশ্ন করি? আমি কি এদের সমতুল্য হতে পারছি? উত্তর পারি নাই। ফলাফল আমি এদের দেখলে ঈষার্নিত হই। আমি সুযোগ পাইলে এদের উপর সহিংস হই। এদের কোন একটা ত্রুটি পাইলেই ক্ষোভ প্রকাশ করি, বুঝি না কিংবা বুঝলেও মানতে রাজি না, মানুষ মাত্রই ভুল করতে পারে, দোষ-ক্রটি থাকবে। অহ! আমিতো এদের মানুষেই মনে করি না, এরাতো নারী! নারীর বাইরে আসার দরকার কি? ভুল করারই দরকারটা কি শুনি? কাজ করার দরকারই নাই, ভুলও হবে না। মানুষ বলতেতো আমি পুরুষ বুঝি! আর যেহেতু আমি মানুষ আর মানুষের ইচ্ছা অনিচ্ছা আছে, দৈহিক চাহিদা আছে নারীদের আমি আমার পুরুষত্ব দেখাই, আমার লালসা পূরনের মাধ্যমে! জোর করে ধর্ষনের মাধ্যমে আমি আমার পুরুষত্ব (পড়ুন পশুত্ব) জানান দেই।
আর ঠিক আমার সাথে এই কাতারে আছে লুইচ্ছা কুলের শিরোমনি হুমো এরশাদ, শুয়োরের পয়দা মওদুদ, ধর্ষনে সেঞ্চুরীয়ান জাবি’র রাসেল, রসুখাসহ আরো অনেকে। হালে ইনসেন্ট চটিলেখক হাসনাত আব্দুল হাই! আর প্রকৃত ইসলামের বিকৃতকারী লেবাসদারীভন্ড প্রতারকদের কথা নাইবা বললাম।
শেষে একটা কথা বলি, আমি বিশ্বাস করি…. এইটা একান্তই আমার নিজের বিশ্বাস… যে পুরুষ বাহিরে নারীর সম্মান দিতে জানে না, তার ঘরে মা, বোন, কন্যা নিরাপদ না…. নিজের বউতো নয়ই…
যেসকল বোনেরা, যারা অশালীনভাবে চলাফেরা করেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলি, আপনাদের কারনে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠি সুযোগ পায়। বলে নারী বেপর্দা হলে, সমাজ নষ্ট হবে। আসলে কিছু নারী পোষাকে এত উগ্র হয়… যেটা বেআব্রু হওয়া। এই সুযোগটাই ওরা নেয়। বেআব্রুতাকে সামনে রেখে অন্য বোনদের পর্দার দোহাই দিয়ে, বস্তাবন্ধি করে রাখতে চায়। সভ্যতার চলমান ধারা ব্যহত করতে চায়। পক্ষে আমিও, কিন্তু সেটা বস্তাবন্ধি অবস্থা না। আল্লাহর ওয়াস্তে আর ঘরে বসে থাকবেন না, নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। কতকাল আর ঘরে বন্ধি থাকবেন! আপনারা বুঝেন না কেন? আপনারা এই পৃথিবীর অর্ধেক! জাগো নারী… জাগো কন্যা–জায়া–জননী…
